Home জাতীয় যা আছে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে

যা আছে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে

by Shohag Ferdaus
সিক্রেটস

বাংলাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে এই প্রথমবারের মতো মামলা দায়ের হয়েছে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে। সচিবালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি নথি ‘চুরির চেষ্টার’ অভিযোগে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে হেনস্তা করার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে এবং পেনাল কোডের অপর দুটি ধারায় মামলা দায়ের করেন।

এর পর থেকেই দেশের সর্বস্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে বহু বছর ধরে প্রায় পরিত্যক্ত এই আইনটি। এই আইনে কী আছে? এই আইনে কেনই বা মামলা দেয়া হলো পেশাদার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে? কিংবা এই আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায় কিনা- এসব প্রশ্ন নিয়ে এখন চলছে জোর আলোচনা।

১৯২৩ সালের ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর ৩ ও ৫ নম্বর ধারায় রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নথি নিজের দখলে নিয়ে অপর পক্ষকে পাচারের বিষয়টি প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের জেল এবং সর্বনিম্ন সাজা দুই বছরের কারাদণ্ড রাখা হয়। এ ধারায় বলা হয়েছে- নিষিদ্ধ স্থানে যদি কেউ যায় বা যেতে উদ্যত হয় কিংবা ওই স্থানের কোনো নকশা বা স্কেচ তৈরি করে বা কোনো গোপন তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করে তবে সে অপরাধী হবে। সামন্ত যুগের প্রভুরাও পাশের মুল্লুকের গুপ্তচর ধরলে মৃত্যুদণ্ড দিতেন। ব্রিটিশরা ভারতীয় স্বদেশিদের দমনের জন্য সেই শাস্তির বিধানই রাখে। আইনের ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় সাজা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে অথবা ১৪ বছরের কারাদ এবং তবে সর্বনিম্ন ৩ বছরের সাজা দিতে পারেন আদালত।

আইনটির সংজ্ঞায় বিধি-নিষেধ-শাস্তি আরোপের ক্ষেত্রে কয়েকটি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- সরকারি জায়গা, যোগাযোগের মাধ্যম এবং নিষিদ্ধ এলাকা। আইনে ‘সরকারি জায়গা’ বলতে সরকারের যে কোনো বিভাগ কর্তৃক দখলকৃত জায়গাকে বোঝানো হয়েছে, যা ওই বিভাগে ন্যস্ত করা হোক বা না হোক। যোগাযোগ বা যোগাযোগের মাধ্যম বলতে কোনো স্কেচ, প্ল্যান, মডেল, ডকুমেন্ট, আর্টিকেল, তথ্য বা এসবের আংশিক বা সম্পূর্ণ বর্ণনা বা ফলাফল দ্বারা যোগাযোগকে বোঝানো হয়েছে। ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ বলতে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ঘোষিত নিষিদ্ধ জায়গা বা এলাকাকে বোঝানো হয়েছে।

এ আইনের ৩(১) ধারায় গুপ্তচরবৃত্তির শাস্তির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অথবা স্বার্থের পরিপন্থি কোনো উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ এলাকায় গমন করে, শত্রুপক্ষের উপকারে আসার মতো কোনো স্কেচ, প্ল্যান, মডেল অথবা নোট তৈরি করে কিংবা কোনো অফিসিয়াল গোপন কোড অথবা পাসওয়ার্ড অথবা নোট অথবা অন্য কোনো দলিলপত্র অথবা তথ্য আহরণ করে, রেকর্ড করে অথবা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে পাচার করে; তবে ওই ব্যক্তি এই ধারায় অপরাধী বিবেচিত হবে। ৩(২) ধারায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থের পরিপন্থিমূলক কাজ এবং ৩(৩) ধারায় অপরাধটি বিদেশি শক্তির স্বার্থে করা হয়েছে বলে ধারণা করা গেলে বা প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছর কারাদে র বিধান রয়েছে। তবে বিদেশি স্বার্থে পাচার না হলে আদালত সর্বনিম্ন তিন বছরের কারাদ দিতে পারেন।

আইনের ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে- কোনো বিদেশি এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবর সংগ্রহ করা যাবে না। আর আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে- কোনো নিষিদ্ধ এলাকা ও সরকার ঘোষিত কোনো এলাকা সম্পর্কীয় কোনো গোপনীয় অফিসিয়াল কোড বা পাসওয়ার্ড বা কোনো স্কেচ, প্ল্যান, মডেল, আর্টিকেল, নোট, দলিলপত্র অথবা তথ্য কোনো ব্যক্তি আইনসংগত দখলে বা নিয়ন্ত্রণে রেখেও যদি যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করে; যদি অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করে; তার নিয়ন্ত্রণাধীন তথ্যাদি অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্র ব্যবহার করে, তাতে সেই ব্যক্তি অপরাধী হবে। ৫ (ক) উপধারা অনুযায়ী কোনো প্রতিরক্ষা নির্মাণকাজ, অস্ত্রাগার, নৌ, স্থল বা বিমানবাহিনীর স্থাপনা বা স্টেশন বা খনি, মাইন ক্ষেত্র, কারখানা, ডকইয়ার্ড, ক্যাম্প বা বিমান বা গোপনীয় অফিসিয়াল কোড সংক্রান্ত অপরাধে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা ১৪ বছর কারাদ। অন্যান্য ক্ষেত্রে অপরাধের সাজা হবে সর্বনিম্ন দুই বছর।

সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের এই আইনটি প্রায় পরিত্যক্ত একটি আইন। এটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হওয়ারও কথা নয়। এই আইনকে টেনে এনে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে পেশাগত কাজের দায়ে ব্যবহার করা হয়েছে- এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং সচেতন মানুষের কাছে খুবই মর্মবেদনার। তিনি আরও বলেন, রোজিনা ইসলাম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে অনেক কর্মকর্তার দুর্নীতির তথ্য জাতিকে জানিয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণেই আক্রোশ থেকে তাকে হেনস্তা করে পরে মামলা দেওয়া হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেন, ব্রিটিশ আমলের এই আইনে ১৯৮৩ সালে হাইকোর্টের রেকর্ডে একটি মামলা দেখা গিয়েছিল। এর পর এ আইনে আর কোনো মামলার কথা শুনিনি। এখন দেখলাম, সচিবালয়ে একজন সাংবাদিককে সরকারি নথি চুরির দায়ে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা দেয়া হয়েছে। আসলে তাদের একটা মামলা দেয়ার দরকার ছিল। খুঁজতে খুঁজতে এই আইন পেয়েছে। ওই যে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখা; সম্ভবত তারা যুতসই আইন খুঁজছিল। এই আইনের কথা যেহেতু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় আছে; সেখান থেকেই সম্ভবত এই আইনে মামলা দায়েরের চিন্তা তাদের মাথায় এসেছে। কিন্তু এ আইনে যেভাবে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটা একদম অপ্রাসঙ্গিক। চুরির মামলা দেওৎয়া হয়েছে; সেটাও তো হয়নি। সরকারি নথিকে কারও সম্পত্তি বা মালপত্র হিসেবে দেখিয়ে মামলার বিষয়টি একেবারেই যুক্তিযুক্ত নয়।

আরও পড়ুন: সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের জামিন শুনানি শেষ

ভয়েস টিভি/এসএফ

You may also like