Home সারাদেশ পুড়িয়ে হত্যা; মুয়াজ্জিনের ৫দিনের রিমান্ড

পুড়িয়ে হত্যা; মুয়াজ্জিনের ৫দিনের রিমান্ড

by Newsroom

লালমনিরহাটের বুড়িমারীতে গণপিটুনি দিয়ে শহিদুন্নবী জুয়েলকে হত্যার পর মরদেহ পোড়ানোর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার বুড়িমারী জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন আফিজ উদ্দিনের(৫৫) ৫দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

১৫ নভেম্বর রোববার দুপুরে আমলী আদালত ৩ এর বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ফেরদৌসী বেগম ৫দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড আদেশ প্রাপ্ত মুয়াজ্জিন আফিজ উদ্দিন পাটগ্রাম উপজেলার ইসলামপুর এলাকার ফইমুদ্দিনের ছেলে। তিনি বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন।

এর আগে শনিবার বিকেলে মুয়াজ্জিনকে আদালতে সোপর্দ করে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পরিদর্শক মাহমুদুন্নবী। রোববার শুনানীর দিন ধার্য করেন আদালত।

রোববার দুপুরে আমলী আদালত ৩ এ আসামী মুয়াজ্জিন আফিজ উদ্দিনকে হাজির করে পুলিশ। এ সময় রিমান্ড আবেদন শুনানী শেষে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ নিয়ে এ ঘটনায় ১১ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এরই মধ্যে মুলহোতা বুড়িমারী ইউনিয়ন শ্রমিকলীগের সভাপতি আবুল হোসেন ওরফে হোসেন ডেকোরেটর এবং মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীসহ ৪জন স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দ প্রদান করেন।

আরও পড়ুন- বুড়িমারী স্থলবন্দর বন্ধ করে চালকদের বিক্ষোভ

এ দিকে এ ঘটনায় রোববার(১৫ নভেম্বর) দুপুরে বুড়িমারী উফারমারা গুড়িয়াটারী গ্রামের মফিজ উদ্দিনের ছেলে হেলাল উদ্দিনকে(৩২) গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে ৫দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। এ নিয়ে এ ঘটনায় মোট ৩৪জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

সর্বশেষ গ্রেফতার হেলাল উদ্দিন হত্যা ও পুলিশের উপর হামলার মামলার এজাহার নামীয় আসামী। তাকে ৫দিনের রিমান্ড চেয়ে করা পুলিশের আবেদনের শুনানী সোমবার ধার্য করেন আদালত। এসব তথ্য নিশ্চিত করেন জেলা গোয়েন্দা(ডিবি) থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) ওমর ফারুক।

এর আগে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটে। নিহত যুবক শহিদুন্নবী জুয়েল রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রিপাড়ার আব্দুল ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে। তিনি রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক গ্রন্থাগারিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। গত বছর চাকরিচ্যুত হওয়ায় কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, শহিদুন্নবী জুয়েল ২৯ অক্টোবর বিকেলে সুলতান রুবায়াত সুমন(৫১) নামে একজনকে সঙ্গে নিয়ে বুড়িমারী বেড়াতে আসেন। বিকেলে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন তারা।

নামাজ শেষে পাঠ করার জন্য মসজিদের সানসেটে রাখা কোরআন শরিফ নামাতে গিয়ে অসাবধানতাবশত কয়েকটি কোরআন ও হাদিসের বই তার পায়ে পড়ে যায়। এ সময় কোরআর ও হাদিস বই তুলে চুম্বনও করেন জুয়েল। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে মুয়াজ্জিনের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সন্দেহবশত জুয়েল ও সুলতান রুবায়াত সুমনকে পাশে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, ওসি বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে যান।

সন্ধ্যায় পুরো বাজারে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে কোরআন অবমাননার দায়ে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। এ সময় উত্তেজিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ভবনের দরজা-জানালা ভেঙে প্রশাসনের কাছ থেকে জুয়েলকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে মরদেহ টেনে পাটগ্রাম বুড়িমারী মহাসড়কে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় স্থানীয়রা। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে।
সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা থানা পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দফায় দফায় চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতার ছোড়া ইট পাথরের আঘাতে পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন্ত কুমার মোহন্তসহ ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ১৭ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর ও পুলিশ সুপার (এসপি) আবিদা সুলতানা অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। নিহত জুয়েলের সঙ্গী রুবায়াত সুমনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ।

ঘটনাটি তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টি এম এ মমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ ঘটনায় নিহত জুয়েলের চাচাত ভাই সাইফুল আলম, পাটগ্রাম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহজাহান আলী ও বুড়িমারী ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাত বাদী হয়ে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনাস্থলের ভিডিও দেখে আসামি শনাক্ত করে অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত ৩৪জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত সবাই বুড়িমারী এলাকার বাসিন্দা বলে জানায় পুলিশ।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি বুড়িমারীতে কোরআন অবমাননার কোন সত্যতা পাননি। গুজব ছড়িয়ে জুয়েলকে পিটিয়ে হত্যা ও পরে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।

ভয়েস টিভি/ডিএইচ

You may also like